মধুপূর্ণিমা (পাঠ : ৫)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব | NCTB BOOK
184

দান, সেবা ও ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল মধুপূর্ণিমা তিথি। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিকেই বলা হয় মধুপূর্ণিমা। এরূপ নামকরণের ক্ষেত্রে দানের একটি কাহিনি রয়েছে, যা বৌদ্ধ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
একসময় বুদ্ধ কৌশাম্বিতে অবস্থান করছিলেন। সে সময় ভিক্ষুদের মধ্যে বিনয় সম্পর্কীয় একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে কলহ-বিবাদের সৃষ্টি হয়। ক্রমে কলহের প্রভাব কৌশাম্বির সকল আবাসিক ভিক্ষুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভিক্ষুরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একসময় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বুদ্ধ সকল ভিক্ষুদের আহ্বান করে কলহ-বিবাদ করা অনুচিত বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন। রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো বিষয়ে অনড় থাকা উচিত নয় বলে তিনি সকলকে জানান। এ উপদেশ প্রদানকালে বুদ্ধ তাদের দীর্ঘায়ু কুমারের কাহিনি বলেন। সে কাহিনিতে উল্লেখ আছে যে, কলহ ও রাগের প্রভাব জন্ম জন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এতে উভয়ের ক্ষতি ছাড়া কোনো মঙ্গল হয় না। এমনকি শুধু কলহজনিত রাগের কারণে কোনো ভালো কাজও উপযুক্ত সময়ে করা যায় না। তাই সব সময় কলহ-বিবাদ পরিত্যাগ করা উচিত। বুদ্ধের নানাবিধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কৌশাম্বিবাসী ভিক্ষুরা কলহ থেকে বিরত হলেন না। নিজেদের মধ্যে কলহ ত্যাগ করে প্রীতির সম্পর্ক তৈরি করতে পারলেন না।
তখন বুদ্ধকৌশাম্বিবাসী ভিক্ষুদের সংসর্গ ত্যাগ করে নিজে একাকী নির্জন গহিন বনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। একসময়তিনি চলে গেলেন পারিল্যেয় নামক বনে। ভিক্ষুদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে তিনি সেখানে স্বচ্ছন্দে অবস্থান করতে লাগলেন। বুদ্ধ বনের মধ্যে একটি ভদ্রশাল গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থান করছিল একটি হাতি। হাতিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের শুঁড় দিয়ে বুদ্ধের বসবাসের জায়গাটি পরিষ্কার করে দেয়। হাতিটি বুদ্ধের জন্য নিয়মিত পানীয় জলও সংগ্রহ করে আনত। সেবা দানের জন্য সব সময় তৎপর থাকত। এভাবে হাতিটি নিজের ইচ্ছাতেই বুদ্ধের সেবায় নিয়োজিত থাকত। বন্য প্রাণী হাতির এরূপ সেবাপরায়ণতা দেখে বনের এক বানরও বুদ্ধকে সেবা করতে আগ্রহী হয়। সেই চেতনায় বানরটি অত্যন্ত শ্রদ্ধাসহকারে বন থেকে মধু সংগ্রহ করে বুদ্ধকে দান করে। বুদ্ধ বানরের দেওয়া মধু সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেন। এতে বানর খুবই প্রীত হয়। মনের সুখে এক বৃক্ষ থেকে অন্য বৃক্ষে লাফাতে থাকে। বানরটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফানোর সময় হঠাৎ মাটিতে পড়ে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বুদ্ধ দিব্যচক্ষুতে দেখলেন যে, মধুদানের ফলে বানর মৃত্যুর পর দেবলোকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেছে। এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে। এ অনন্য ঘটনাকে স্মরণ করে বৌদ্ধরা এ পূর্ণিমা তিথিতে ভিক্ষুসঙ্ঘকে মধু দান করে।

এসব কারণে ভাদ্র পূর্ণিমাকে মধুপূর্ণিমা বলা হয়। এছাড়া কৌশাম্বির ভিক্ষুরাও নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে কলহ ত্যাগ করেন এবং পারস্পরিক মধুময় সম্পর্ক সৃষ্টি করতে সমর্থ হন।

এ পূর্ণিমায় যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়, তা প্রায় অন্যান্য পূর্ণিমা অনুষ্ঠানের মতো। মধু দান করা এ পূর্ণিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ তিথিতে বৌদ্ধরা বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের উদ্দেশে মধু দান করে। বিহারে আগত উপাসক-উপাসিকারা পরস্পরকে মধু ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে। এভাবে দান ও সেবার ঐতিহ্যকে ধারণ করেই মধু পূর্ণিমা পালন করা হয়।

অনুশীলনমূলক কাজ
মধুপূর্ণিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কী?

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...